২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং, ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৪ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী




শিরোনামঃ-

১৯৭১ এর একমাত্র নারী সাহিত্যিক সাংবাদিক শহীদ সেলিনা পারভীন

ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

Share Button

 সাহিদা সাম্য লীনা-

শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। জন্ম ১৯৩১ সালেে ৩১ শে মার্চ বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার রায়গঞ্জের ছোট কল্যাণনগর গ্রামে। পৈত্রিক নিবাস ফেনী নাজির রোড এর মাষ্টার বাড়ি। তার বাবার নাম মৌলভী আবিদুর রহমান আর মায়ের নাম সাজেদা খাতুন। শিক্ষিত পিতামাতার সন্তান ছিলেন সেলিনা। এজন্য পড়ার পরিবেশ ছিল তাঁর অনুকূলে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাঁর পরিবার গ্রামে চলে যাবার ফলে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে হয় তাঁকে।
যার কথা লিখতেছি অনেকগুলো উপাধী তাঁর। সব উপাধীতেই তিনি সফল। কবি.সাহিত্যিক, সাংবাদিক,লেখিকা, বুদ্ধিজীবী ছিলেন সেলিনা পারভীন। ১৯৭১ সালে একমাত্র নারী সাংবাদিক তিনি। যাকে বুদি¦জীবী তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী নির্মম ভাবে হত্যা করে। আজকে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বুদ্ধিজীবীদের আমরা স্বরণ করি তাদের মধ্যে শহীদ সাংবাদিক একজন নারী; নামে যার মূল পরিচয়। সেলিনা পারভীন নাম আসলেই তার সেই আত্বাহুতির কথা সবার স্বরণে আসে। শহীদ শব্দাট আসলেই আমাদের মনে আসে প্রথমেই দেশ মাতৃকার জন্য যুদ্ধ করার সেই দুঃস্বহ মধুর স্মৃতির কথা। মায়ের ভাষার জন্য আত্বাহুতির কথা। আমরা হ”্ছি সেই জাতি পৃথিবীতে যাঁরা ভাষার জন্য জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছি মায়ের ভাষা আমাদের কাছে কতনা মধুর এবং গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিশ লাখ শহীদ ভাই আর দু লাখ শহীদ মা বোন এর ইজ্জতের বিনিময়ে এই প্রিয় স¦াধীনতা। এই স্বাধীনতার স্বপক্ষে বলিষ্ঠ ভুমিকা নিয়েছিলেন ফেনীর অহংকার আমাদের গৌরব সেলিনা পারভীন। এক হিসেবে তাকে আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও আবিষ্কার করি। কারণ ৭১ এর যুদ্ধে তার নিজের পত্রিকার বিক্রয়লব্দ আয় দিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ঔষধ, অর্থ, ও খাবার সরবরাহ করতেন। তার পত্রিকা ”শিলালিপি” স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছিল। এই পত্রিকায় লেখার মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তি সংগ্রামে জড়িত হন। এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল দিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের যে সহানুভূতি দিয়েছেন পরোক্ষভাবে তা দেশের জন্য লড়াই এর নামান্তর। অবশেষে জীবন দান। কী অসহ্য যাতনা বুলেটের তীব্র আঘাত সয়ে একজন নারী ন¤্র হৃদয়ের অধিকারী বন্দুক দেখেই অত্যন্ত ভয়ে শহীদ হবার আগেই যেন মরে গেলেন ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে । ছোট্ট তার অবুঝ শিশু তার চোখের সামনে ভাসছিল। কিছুক্ষণ পরেই মা ফিরে আসবে এই আসস্থ করে এসেছিল তার একমাত্র বুকের ধন সুমন জাহিদকে। নরপিশাচদের কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেনও আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আর লিখবনা। পত্রিকা প্রকাশ করবোনা। অনেক দূরে আমার ছেলেকে নিয়ে চলে যাব। এখানে ফুটে উঠেছে এক মমতাময়ী মা এর হাহাকার স›তানের জন্য। কিন্তু নরপিশাচরা তার সেই করুণ আর্তি শুনা তো দূরে থাক মুহূর্তেই মুখে ঢুকিয়ে দেয় গুলি। আর সেই সাথে সুমন হারায় তার মাকে । আমরা হারাই একজন সাহসী নারী সাংবাদিককে. একজন সাহিত্যিক কে, একজন বুদ্ধিজীবিকে। ঐ সময় সেলিনা পারভীন বেঁচে গেলে আমাদের দেশটা পেত একটা রতœ’র মেধার পরিস্ফুটন! আরো দেখিয়ে যেতে পারত আগামীর প্রজন্মের জন্য অনেক জ্ঞানগর্বের বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তারই জন্মস্থানের কুখ্যাত রাজাকার চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এর সহায়তায় কবিকে পাকিস্তানি হানাদারদের চক্ষুসূল হতে হয়। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এলাকার মানুষ পরিচয় দিয়ে বহুদিন সেলিনা পারভীন এর গতিবিধি নজরে রাখতো আর সেই সুযোগে তার ঠিকানাও সংগ্রহ করে এবং আলবদর বাহিনীকে সব খবর সরবরাহ করে। তারই ফলশ্রুতিতে; সেলিনা পারভীনকে তারা ধরে নিয়ে যায়। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বদ্ধভূমিতে অন্যান্য শহীদের সাথে তার লাশ পাওয়া যায়।
একজন সংগ্রামী নারী ছিলেন সেলিনা পারভীন। যদিও তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা ও প্রগতিশীল পরিবারের মেয়ে। ছোট বেলা থেকেই তিনি পেয়েছিলেন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রতি অনুপ্রেরণা। তথাপিও পরবর্তী জীবনে তাঁকে আত্বনির্ভরশীল হবার জন্য বিভিন্ন জীবন সংগ্রামে তাঁকে লড়তে হয়েছে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁকে বিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এ বিয়েটা ছিল তার অমতে। তাই স্বামীর বাড়ীও যাননি। অবশেষে তাকে সেই বিয়ের জন্য তালাকপ্রাপ্ত হতে হয়। তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। কারণ তিনি এস.এস.সি পরীক্ষা দেন, কিন্তু সে পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেননি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন না করতে পারলেও তিনি বসে থাকেননি। তিনি প্রচুর সাহিত্য ও বাংলা ভাষার বই পড়াশোনা করেন ও নিজেই জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হন। এ ছাড়াও বাঙ্গালী নারীর সব গুণই ছিল তার মাঝে। যেমন ছিলেন সুন্দরী তেমনি ছিল সব গুণ। তিনি গান জানতেন,ছবি আঁকতেন। অবসরে ফুল গাছ লাগাতেন এবং অল্প আসবাবে তিনি ঘরকে মোহনীয় করে সাজাতেন। সর্বোপরি যে গুণে তাঁকে অবশেষে জীবন দিতে হয়েছে। তিনি অসংখ্য গল্প কবিতা,প্রবন্ধ,নিবন্ধ লিখেছেন। প্রকাশও হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। আত্বনির্ভরশীল হবার জন্য প্রথমে তিনি নার্সিং ট্রেনিং এ ভর্তি হন। কিন্তু সেটা ভাল না লাগায় ছেড়ে দিয়ে চাকরীর সন্ধান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে মেট্রন পদে চাকরী পেয়ে যান । ১৯৫৮-১৯৫৯ সাল পর্যন্ত এই দুবছর তিনি এখানে চাকরী করেন। অবশেষে পরিবারের চাপে তাঁকে ১৯৬২ সালে এক রাজনৈতিক ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। কিন্তু এই সংসার জীবন তার বেশীদিন টিকেনি। কারণ সেই সংসার তার সবচাইতে প্রিয় সাহিত্য সংস্কৃতির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সংস্কৃতিমনা এই বিদুষী নারী তাই শেষ পর্যন্ত স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ নেন। তখন তাঁর কোলে একমাত্র পুত্র সন্তান সুমন। চলে যান সুমনকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে। এ সময় তিনি সলিমুল্লাহ এতিমখানায় ও আজিমপুর বেবী হোমে পর পর চাকরী নেন ।
সেলিনা পারভীন বাংলােেদশের প্রথম নারী সম্পাদিত পত্রিকা ’বেগমে’ চাকরী নেন ১৯৬৮ সাল্।ে ছেলে সুমনকে নিয়ে জীবন নির্বাহের জন্য তিনি বিভিন্ন চাকরী পরিবর্তন করেছেন। কেননা তিনি সচেতন, স¦াধীনতাপ্রিয় আত্বমর্যদাশীল নারী ছিলেন। অভাবের মধ্যে থেকেও তিনি শালীনতা এবং ব্যক্তিত্ব্য বজায় রেখে চলতেন। বেগম পত্রিকা থেকে এসে তিনি ললনা পত্রিকায় কাজ করেন। সেখানে তাঁকে বিজ্ঞাপনের কাজ দেয়া হয়। যদিও এ কাজ তাঁর ভাল লাগতোনা। কিনÍু জীবিকার জন্য তিনি এ কাজ করতে বাধ্য হন।
এরপরেই তিনি তাঁর পত্রিকা শিলালিপি প্রকাশ করেন। নামের মাহাত্ব আছে বলা যায়। এই শিলালিপিতেই দেশের বুদ্ধিজীবীদের লেখা প্রকাশ হতো। তিনি নিজেও লিখতেন কলাম, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও কবিতা। তার কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্খা ফুটে উঠে। ১৯৬৯ সালের ৩ জানুয়ারী শহীদ সেলিনা পারভীন দুটি কবিতা লিখেন ডঃ রাজিয়া খানের ডায়রীতে । কত না গভীর সম্পর্ক থাকলে কারো ব্যক্তিগত ডায়রীতে তিনি কবিতা লিখেন। একজন সাহিত্যিক,সাংবাদিক হবার কারণে এই সমস্ত জ্ঞনীদের সাহচর্যে তিনি গিয়েছেন। সে ডায়রীতে লেখা তাঁর কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্খা ফুটে উঠে- ’’ সহযোদ্ধারা অন্ধকার কোণ ছেড়ে/ বিদ্ধ কর, বিদ্ধ কর ঐ কুচক্রীা আকাশ।/ হে একতা তোমার বর্শা/ দেখবে সারমেয় আর শিক/ লেজ গুটানো এক পাত্রে।” দেশের জন্য, ভাষার জন্য সেলিনা পারভীন এতটা নিবেদিত ছিলেন যে তার প্রতিটা কলমের কালির দাগে সেই সাক্ষর চিরঞ্জীব। ভাষা সৈনিক আসাদদের নিয়ে তিনি লিখেছিলেন- মাগো কতদিন খাইনি তোমার হাতের/কুমড়ো ফুলের বড়া/ কচি মিঠা কদু, ডিম ভরা কই মাছ দিয়ে/ মাচানের কদু মাচানে শুকায়/ মায়ের কলিজার সাথে।/ এ জীবনে আর একটি ঘন্টার/ ছুটিও সে তার মায়ের তরে/ নিতে পারবেনা হায় আর/ দোয়া মাগি আল্লাহ/ আমার বাছার সাধ যেমনি সে চেয়েছিল মাতৃভূমির সাজ/ ওপার থেকে দেখুক সে অন্তত আজ।’’
সাংবাদিক সেলিনা পারভীন তাঁর এ আত্বত্যাগের স্বীকৃতি স্বরুপ ঢাকার মৌচাক হতে মগবাজার মোড় পর্যন্ত রাস্তা ও ফেনীর নাজির রোড এর নামকরণ করা হয়েছে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক। তার ছেলে সুমন জাহিদ ১৯৯৩ সাল থেকে মায়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য অনেক পরিশ্রম করেন। জাতীয় জাদুঘরে এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তার ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত আছে। সাংস্কুতিক মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে ১৯৭১ এর শহীদ হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতিপত্র দেয়া হয়। নির্দেশক শামীম আকতার সেলিনা পারভীনের জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করেন ’শিলালিপি’। এ ছবিটি তাঁকে উৎসর্গ করা হয়।
একজন বিদুষী বুদ্ধিজীবী নারী শহীদ। প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর আসলে বুদ্বিজীবীদের স্বরণ করা হয়। সেই সব শহীদদের সাথে আমাদের সেলিনা পারভীন ঘুমিয়ে আছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন সেলিনা পারভীনও সবার হৃদয়ে জাগরুক থাকবে।




সর্বশেষ খবর

আজকের সর্বাধিক পঠিত

  • No results available

সর্বাধিক পঠিত

  • No results available

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী

সম্পাদক ও প্রকাশক-শফিকুর রহমান চৌধুরী (এম এ)

বার্তা সম্পাদক-মাঈন উদ্দিন দুলাল

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদকীয় অফিস :জোড্ডা বাজার,নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা-৩৫৮২

বার্তা বিভাগ-০০২১৮৯২৮২৭৬৯০১,ইমো নাম্বার

Email- nangalkottimes24@gmail.com

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET
error: কপি করা থেকে বিরত থাকুন।